Sunday, December 17, 2006

আড্ডায় বিজয় উত্‍সব

অনেকদিন পর খুব চুটিয়ে আড্ডা হলো৷ বিজয় দিবসের আড্ডায় যাদেরকে নিমন্ত্রণ করেছি মোটামুটি তারা সবাই এসেছেন৷ সবার সাথে পরিচয়ের পর পরই তাদের কথা বিশদভাবে বলব৷ দুপুরে চারটার দিকে চলে আসলেন কৌশিক৷ দরজা না খোলা পর্যন্ত দরজার কলিং বেলের বোতামে হাত দিয়ে রেখেছিলেন কৌশিক৷ এতোটা আগেভাগে তাকে দেখে আমি একটু তাজ্জব হলাম৷ দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকে বলল, "তাড়াতাড়ি চলে এলাম, আপনার যদি কোন সাহায্য লাগে"৷ আমি আশ্বস্ত করে বললাম, ভাল করেছেন আগেভাগে এসে৷ ঢুকেই হলওয়েতে স্মৃতিসৌধের বিশাল ছবিটা দেখে এক দৃস্টিতে তাকিয়ে বিষন্ন হয়ে পড়ে সম্ভবত: দু'একটা খিস্তি এক অদৃশ্য শত্রুর দিকে ছুঁড়ে মারল৷

বাঙ্গালীর সবকিছুতে একটু দেরীতে আসার আর একটু দেরীতে উঠবার বাতিক আছে৷ তাই দু'ঘন্টা আগে উপস্থিত কৌশিককে দেখে বেশ হাসি টেনে বললাম, "ভালই হলো, আড্ডার আয়ু দু'ঘন্টা বাড়ল"৷ কিন্তু ঘরে ঢুকেই কৌশিক ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল টিভির রিমোটের সন্ধানে৷ কৌশিক জানালো জিটিভিতে কি একটা এপিসোডের শেষ অংশটা না দেখলে তার চলবে না৷ তার সাহায্যের ধরণে আমিও খুশী না হয়ে পারলাম না৷

তার কিছুণ পরই চলে আসলেন শুভ৷ অমি মোবাইলে জানিয়ে দিল নতুন ওয়েবসাইট জন্মযুদ্ধের একটা সিডি খুঁজে পাচ্ছে না৷ ওটা এক জায়গায় পৌঁছে দিয়ে সে চলে আসবে৷ তার কিছুণ পর আসলেন কবি জলিল ও কালপুরুষ৷ তারা একসাথেই হয়তো কাওকে নামিয়ে দিয়ে এসেছেন৷ একটা ব্যাপারে দু জনেই একমত যে, বউ পাশে না থাকলে অনেককেই বিপদ আপদে রাইড দেয়া যায়৷ আমি মুখে হাসি টেনে সম্মতি দিলাম৷

তার কিছুণ পরই এসে যোগ দিলেন রসময় হিমু ও মুখফোঁড়৷ হিমুর হাতে ছোট একটা এমপি ফোর৷ মুখফোঁড় ওটা বাগাবার চেস্টা করছে৷ হিমু তার হাতের শেষ সম্বল ছাড়তে নারাজ৷ খালি বলে, "আমার হাতেই জিনিসটা তোমাকে দেখতে হবে"৷ টানা ড্রইং রুমের অন্ধকার ঘুপচির মধ্যে বসল এরা দু'জন৷ আমিও কৌতুহুলী হয়ে উঠলাম কি করছে এরা দু'জন এই এমপি ফোর নামের ছাকানাকা নিয়ে৷ কিন্তু কাছাকাছি গেলেই এরা বিবাদ বন্ধ করে বলে, "সিস্টেম কাজ করছে না৷ ভিডিওটা দেখা যাচ্ছে না"৷ এক পর্যায়ে জিগ্যেস করতে বাধ্য হলাম, "কি দেখছো তোমরা"? হিমুর মুখে লেপ্টে আছে রহস্যময় কামড়ানো হাসি৷ "হিমু পুরনো হিন্দী মুভির লামহে'র গান ডাউনলোড করেছে" এক রাশ রহস্য মেখে মুখফোঁড় তথ্যটা দিল৷ কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারটা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভোটার লিস্টের মতো এতো রহস্য কেন তা বুঝলাম না৷ কে জানে?

তার কিছুণ পর পরই তীরন্দাজ, সুমন চৌধুরী ও ধুসর এসে হাজির৷ দীর্ঘ ভ্রমনে তাদেরকে কান্ত মনে হলেও বেশ উচ্ছল ও উওেজিত মনে হচ্ছিল৷ এতো ব্লগারদের একসাথে দেখা হবে এটা চিন্তাও করেননি তারা৷ সুমন কিছুণ পর পরই বলছেন, "ইজি যেতে হবে, ইজি যেতে হবে"৷ বুঝলাম, কমরেড দীর্ঘ সফরে কান্ত পোড় খাওয়া মানুষ৷ একসময় যুদ্ধে যেতেন৷ এখন ইজি পদ্ধতিতে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে চান৷ ছয়টা বাজার ঠিক এক মিনিট আগে একেবারে বৃটিশ কায়দায় হাজির হলেন শোহেইল, হাসান, হাসান (মোরশেদ), মাসুদা ভাট্রি ও মহুয়া মঞ্জুরী৷ শোমচৌকে দেখে কে যেন পাশ থেকে প্রয়াত হীরকের নাম ধরে ডাকল৷ কি আশ্চর্য৷ হীরকের হোমোসাইডের ব্যাপারে শোমচৌ'র একটা হাত আছে বলে লন্ডনীয় গুজবটা রং চং মেখে এখনও চলছে৷ তবে হীরকের মৃতু্যর জন্য তার অতি জনপ্রিয়তা দায়ী এটা কিন্ত অনেকেই বুঝতে চান না৷ রবীন্দ্রনাথও কিন্তু লাবণ্যকে পাওয়ার জন্য উচ্ছল অমিতের ভালবাসার কবর দিয়েছিলেন এটা ক'জনে জানে?

সবার শেষে চলে আসলেন সাদিক, অরূপ, মাশীদ, ও গোপাল৷ অরূপ বিলম্বের জন্য সাদিককে দোষারোপ করা মাএই সাদিক হাসিমুখে মেনে নিলেন৷ তবুও একবারের জন্যও সাদিক ফাঁস করে দিলেন না অরূপ-মাশীদের টাইম ম্যানেজমেন্টের সমস্যার কথা৷ যে কারণে তাদের আসতে দেরী হলো৷ শেষ আওয়াজটার সাথে ঘরে ঢুকলেন সাধক৷ সবাই স্বাগত জানাল সাধককে৷ অনেকে তার হাতের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে রইলেন৷ না, একদম খালি হাতে সাধকের আগমন৷ তার একটু পরেই হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল অমি৷ সাথে জামাল ভাস্কর৷ অমি বলল, "বস্, সরি একটু দেরী হয়ে গেল"৷ পরে শুনলাম, বেচারারা আজিজ মার্কেটে ছিল, অস্ট ডট রাসেলকে আনতে গিয়েই দেরী৷ রাসেল সাফ বলে দিয়েছে সে আসতে পারবে না৷ কি একটা তার্কিক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া নিয়ে প্রচন্ড ব্যস্ত৷

বিশাল ড্রইং রুমে সবাই নিজেদের মতো বসে গেছেন৷ কালপুরুষ, জলিল ও তীরন্দাজ কবিতা নিয়ে আলোচনা করছেন৷ কবিতার পরিশীলিত উওরাধুনিক ভাবনায় দেখলাম অন্যদের তেমন কোন আগ্রহ বা মনোযোগ নেই৷ সাদিক সুমনের পাশে বসে এখনও কাসেল ভ্রমনের স্মৃতির জাবর কাটছেন৷ মাশীদ, মাসুদা, ও মহুয়া জটলা করে কি নিয়ে কথা বলছেন তা বোঝা যাচ্ছে না৷ তবে উল্টো দিকে সবাই সাধককে ঘিরে বিভিন্ন সাধ্য সাধনার কথা বলে যাচ্ছে ৷ সেখানে হিমুও আছে৷ কিন্তু হিমু সেখানে বসে থাকলেও তার চোখ পড়ে আছে মহুয়ার দিকে৷ ব্যাপারটা দেখেও আমি না দেখার ভান করলাম৷ শুধু হিমুই বুঝল আমি কি বুঝেছি৷

এতো কোলাহলের মধ্যেও অরূপ ঠিকই কম্পিউটারের সামনে বসে কি যেন গুতাগুতি করছে৷ এক সময় বেশ চড়া গলায় বলল, মেসেঞ্জারে অপ বাক, উত্‍স ও এস এম এম মুর্শেদ এখানকার আড্ডা খুব মিস করছেন বলে খবর পাঠিয়েছেন৷ এস এম মুর্শেদ অবশ্য খুব বিপাকে পড়ে আছেন৷ ভদ্রলোক ব্লগিং ব্যবসার চীট কোড তার ব্লগে বসিয়ে অনেকের ব্যবসার বারোটা বাজিয়েছে বলে বেশ হুমকি ধামকি খাচ্ছেন৷ ভাগ্যিস আগেই আটলান্টিকের ওপারে আশ্রয় নিয়েছিলেন৷ খারাপ খবর শুধু একটাই৷ বিশিস্ট ব্লগার হযবরল অতিরিক্ত স্পীডে গাড়ী ড্রাইভ করতে গিয়ে আবারও ফেয়ারফ্যাঙ্ পুলিশ কতর্ৃট ধৃত হয়ে বেশ নাকানিচুবানি খেয়েছেন৷ অরূপ খবরটা আমাকে দিয়েই আবারও কম্পিউটারটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷ দাওয়াতে এসে যে কম্পিউটার নিয়ে এই ব্যস্ততা বাড়াবাড়ি তা অরূপের কাছে মনেই হচ্ছে না৷ আসলেই যার যেটার অভাব সে সেটা থেকে মুক্তি পাবে কি করে?

ইতিমধ্যে ডালপুড়ি আর চা দু'বার দেয়া হয়েছে৷ অতি আলোচনায় যারা ব্যস্ত তারা কিছুই টানছেন না দেখে সুমন, ধুসর ও মুখফোঁড় তার সদ্ব্যবহার করে যাচ্ছেন৷ সবাই তাদের হাতের লেখাগুলোর উপর চোখ বুলাচ্ছেন৷ খাওয়ার পর পরই একটা ছোট উপস্থাপনা আছে৷ এতে কেউ কবিতা, কেউ গল্প আর কেউ বক্তৃতা দেবেন৷ আড্ডার নিমন্ত্রনে কথা কিন্তু এরকমই ছিল৷ এমন সময় কলিং বেল বাজা দেখে আমি গেলাম৷ দরজা খুলেই খুব জোরে চীত্‍কার করে বললাম, চোর!!! আমার চীত্‍কার শুনে কৌশিক আর অরূপ কোত্থেকে বেজবল ব্যাট নিয়ে হাজির৷ কে জানে কি ভেবেছিলেন তারা? বানরের উপদ্রব কমলেও একেবারে যে যায়নি৷ এধরণের একটা আশঙ্কায় যে তারা অবচেতন মনেই হাতে ব্যাট তুলে নিয়েছেন৷ যখন পরিচয় করিয়ে দিলাম, "এই চোর সেই চোর না৷ এই চোর হচ্ছে আমাদের ব্লগের সেরা কমেন্টার চোর"৷ হাতের ব্যাট ফেলে চোরকে জাবরে ধরে ড্রইং রুমে নিয়ে আসল অরূপ আর কৌশিক৷ শুরু করল তাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার৷

এই মুহুত্তের্্ব আমার মনের মধ্যে একটা অপরাধবোধ হাঁটছিল, কথা দিয়েছিলাম সেরা কমেন্টার চোরকে "চোর" বলে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেব না৷ আমার ভুলের জন্য নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল৷ এই মুহুত্তের ড্রইং রুমে বসে থাকা সবার কাছে নিজের ভুল ভ্রান্তির জন্য ক্ষমা চাইতে মন চাচ্ছে৷ ডাইনিং রুমের দিকে তাকিয়ে দেখি গরম খিঁচুরী ও ভুনা মাংস সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ আলাপচারিতায় মগ্ন সবাইকে পরবতী এপিসোডের জন্য কিভাবে ডাকব ভাবতে ভাবতে আমি এগোচ্ছি... (ক্রমশ..............অপেক্ষায় থাকুন, দেখা হবে পরের এপিসোডে)৷

4 comments:

Anonymous said...

দারুণ লিখেছেন এটা। এরকম একটা আড্ডা হলে মন্দ হতো না।
স্বাগতম ব্লগস্পটে । বাংলা ইউনিকোডের জয় হোক ।

Addabaj said...

হবে আড্ডা। ভাবনাগুলো পাখা উড়িয়ে বাস্তবে ধরা দেবে। ধন্যবাদ।

Suman said...

thikase

সুমন চৌধুরী said...

the good old days of bangla blogging....